৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা !
একজন গর্ভবতী মায়ের নিজের শরীর এবং গর্ভের সন্তানের সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্যের
জন্য পূর্বে থেকেই সচেতন হওয়া উচিত। কারণ পূর্ব থেকে সচেতন না হলে নিজের জীবনের
ঝুঁকির সাথে সাথে একটি অপুষ্ট ও বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মাতে পারে। তাই বিশেষ করে ৩
মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সুষম ও পুষ্টিকর খাবার রাখা
আবশ্যক।
কারণ গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক গঠনের জন্য যে সকল
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গুলোর প্রয়োজন হয় তা গর্ভধারিনী মায়ের খাদ্য অভ্যাসের উপর
নির্ভর করে। তাই এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আজকে জানবো, একজন তিন মাসের গর্ভধারিণী
মায়ের খাবার তালিকায় যে সকল সুষম ও পুষ্টিকর খাবার রাখার প্রয়োজন তারই একটি
সম্পূর্ণ গাইড লাইন।
পেজ সূচিপত্রঃ ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা।
- কেন ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ?
- ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় বিভিন্ন ভিটামিন এর ভূমিকা !
- গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার সমূহ ।
- মায়ের শরীরের শক্তি বৃদ্ধি, সন্তানের স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ রাখাতে ভিটামিন বি এর ভূমিকা ।
- কোলাজেন তৈরিতে ভিটামিন সি এর অবদান কতটুকু ?
- ভিটামিন ডি এর প্রধান প্রাকৃতিক উৎস কোনটি ?
- শরীরের ডিএনএ সংশ্লেষণ ও মেরামতে ভিটামিন বি-৯ এর কাজ ।
- ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় মিনারেল এর ভূমিকা !
- গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় আয়রণ এর ভূমিকা ।
- শিশুর হাড়, দাঁত, হৃদপিণ্ড ও মাংস পেশী গঠনে ক্যালসিয়াম এর ভূমিকা ।
- গর্ভবতী মায়ের জন্য কতটুকু জিংক এর প্রয়োজন এবং এর উৎস।
- গর্ভস্থ শিশুকে ঘিরে থাকা পানির ভারসাম্য বজায়ে ফ্লুইড এর ভূমিকা ।
- গর্ভের সন্তানের জন্য ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড কেন গুরুত্বপূর্ণ ।
- বিষয় এর শেষ কথা।
কেন ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ?
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে অর্থাৎ প্রথম তিন মাসে একজন মায়ের শরীরে হরমোনের বৃদ্ধি
শুরু হয়ে থাকে যার কারণে সব সময় বমি বমি ভাব অথবা অনেক সময় বমি হতে পারে। এই
সময়টাতে একজন মা পরিমিত খাদ্য গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে। যার কারণে গর্ভবতী
মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব দেখা দেয়। আবার অনেক সময় একজন
গর্ভবতী মায়ের বিভিন্ন বিষয়ে অসতর্কতার কারণে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে
যায় অর্থাৎ গর্ভপাত ঘটে থাকে। তাই গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস এই সময়টাতে একজন
গর্ভবতীনের মায়ের উচিত নিজের এবং গর্ভের সন্তানের সুস্থতার জন্য বাড়তি সর্তকতা
অবলম্বন করা।
মূলত একজন নারী যখন সন্তান গ্রহণের পরিকল্পনা করবে তখন থেকেই নিজের এবং অনাগত
সন্তানের সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন বিষয়ের উপর যত্নবান হওয়া
অত্যাবশ্যক। এই বিশেষ যত্নের মধ্যে খাদ্য অভ্যাস হল অন্যতম। কারণ গর্ভধারণ থেকে
শুরু করে সন্তান জন্ম নেওয়ার আগ পর্যন্ত একজন গর্ভবতী মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত
পরিমাণ পুষ্টির প্রয়োজন হয়ে থাকে।
আর গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকার উপর মায়ের শরীরের স্বাস্থ্যগত
ঝুকি এবং সন্তানের দৈহিক গঠন কাঠামো কেমন হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করে। তাই ৩
মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যার মাধ্যমে
একজন মা সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকতে পারে এবং অনাগত সন্তানটাও সুস্বাস্থ্য এবং রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে জন্মাতে পারে।
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় বিভিন্ন ভিটামিন এর ভূমিকা !
গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস একজন মা এবং নবগঠিত ভ্রূণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পিরিয়ড।
এই সময়টাতে গর্ভধারিণী মায়ের শারীরিক সুস্থতা, ভ্রূণের পরিপক্কতা ও সঠিক
বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি বা শক্তির প্রয়োজন। আর এই পুষ্টি বা শক্তির
মানদণ্ড গর্ভধারিনী মায়ের খাদ্য অভ্যাসের উপর নির্ভর করে থাকে। এ কারণে
প্রথম ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় অন্ততপক্ষে প্রতিদিন ২০০০
ক্যালরি সম্পূর্ণ খাবার রাখা উচিত। যার একটি বড় অংশ বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন
যুক্ত খাবার থেকে পাওয়া যেতে পারে।
গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার সমূহ।
বিভিন্ন ধরনের রঙিন শাকসবজি ভিটামিন এ এর অন্যতম উৎস। যেমনঃ পুঁই শাক, লাল শাক,
মূলা শাক, পালং শাক, মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি আলু, গাজর, ব্রকলি, টমেটো ইত্যাদি এবং
ফলের মধ্যে রয়েছে তরমুজ, পেয়ারা, পাকা পেঁপে, পাকা আম, কমলা, মালটা, কাঁঠাল
ইত্যাদি। এছাড়াও ডিমের কুসুম, দুধ, মাখন, পনির, ছোট মাছ এবং গরু বা খাসির
কলিজায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন এ থাকে।
তবে ঘন ঘন বা বেশি পরিমাণ কলিজা খাওয়া উচিত নয়। কারণ এতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন
এ থাকার কারণে ভিটামিনোসিস হতে পারে ফলে মিসকারেজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদিও
ভিটামিনোসিস হওয়ার জন্য অতিরিক্ত ভিটামিন ঔষধ বা সাপ্লিমেন্ট সেবন দায়ী তবুও
গর্ভাবস্থায় যেহেতু একটি নাজুক সময় তাই প্রথম তিন মাসের গর্ভবতী মায়ের
খাবার তালিকায় সঠিক মাত্রায় ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার রাখাই বাঞ্ছনীয়।
নোটঃ ভিটামিন এ যেহেতু চর্বিতে দ্রবণীয়, তাই এটি শোষণের জন্য অল্প পরিমাণ চর্বি
বা তেলযুক্ত খাবারের সাথে গ্রহণ করা ভালো। আর একটা বিষয় হল বেশি পরিমাণে ভিটামিন
এ ট্যাবলেট বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে, তাই গর্ভবতী মায়ের জন্য
প্রাকৃতিক খাবারই উত্তম।
মায়ের শরীরের শক্তি বৃদ্ধি, সন্তানের স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ রাখাতে ভিটামিন বি !
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ভিটামিন বি অন্যতম ভূমিকা পালন করে। এগুলো
গর্ভবতী মায়ের শরীরের শক্তি বৃদ্ধি, সন্তানের স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ রাখা ও মায়ের
বিপাক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। যেমনঃ মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার (দুধ, দই, ক্ষীর,
পনির ইত্যাদি), আস্ত শস্য যেমনঃ (মটর শুটি, মসুর ডাল, ছোলা, বাদাম), সবুজ শাকসবজি
এবং সাইট্রাস জাতীয় ফল অর্থাৎ লেবুজাতীয় ফল (কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা,
বাতাবি লেবু এবং কাগজী লেবু উল্লেখযোগ্য) ভিটামিন বি এর অন্যতম উৎস। এছাড়াও
অ্যাভোকাডো, কলা, ওটস, বাদামী চাল, গম এবং এ থেকে তৈরি খাবারে প্রচুর পরিমাণ
ভিটামিন বি রয়েছে ।
নোটঃ ভিটামিন বি-১২ মূলত প্রাণিজ জাতীয় খাবার থেকে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়, তাই
যারা নিরামিষ ভোজী, তারা দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম অথবা ফোর্টিফাইড খাবার খেতে
পারেন। তবে ফোর্টিফাইড খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ
অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করতে হবে।
কোলাজেন তৈরিতে ভিটামিন সি এর অবদান কতটুকু ?
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ভিটামিন সি এর ভূমিকা কোন অংশে কম নয়। ৩
মাসের গর্ভবতী মায়ের যেহেতু এটি একটি নাজুক সময় এই সময় শরীর অনেক দুর্বল থাকে
তাই মায়ের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, ত্বক সুন্দর রাখতে এবং কোলাজেন বা
প্রাকৃতিক প্রোটিন তৈরিতে ভিটামিন সি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ প্রধান খাবারগুলোর মধ্যে পেয়ারা, আমলকি, লেবু, কমলা, মাল্টা,
কাঁচা মরিচ, ব্রোকলি, স্ট্রবেরি, পেঁপে, জাম, এবং আমড়া অন্যতম। ভিটামিন সি
সমৃদ্ধ খাবার শরীরকে ভাইরাস সংক্রমণ (যেমন- জর, ঠান্ডা ও কাশি) থেকে রক্ষা করে।
তাই একজন তিন মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় প্রতিদিন কিছু ভিটামিন সি
সমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত।
নোটঃ যেহেতু ভিটামিন সি তাপে নষ্ট হয়ে যায়, তাই ফলমূল সাধারন তাপমাত্রাই রেখে
এবং শাকসবজি কাঁচা বা কম রান্না করে খেলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়।
ভিটামিন ডি এর প্রধান প্রাকৃতিক উৎস কোনটি ?
ভিটামিন ডি এর প্রধান প্রাকৃতিক উৎস হলো সূর্যালোক, সূর্যালোক থেকে প্রাপ্ত
ভিটামিন ডি ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের জন্য নিরাপদ এবং কল্যাণকর। তবে কিছু কিছু
খাবার থেকে এটি পাওয়া যায়। যেমনঃ ভিটামিন ডি এর প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে
চর্বিযুক্ত মাছ (স্যামন, টুনা, ম্যাকেরেল, সার্ডিন এবং রূপচাঁদা মাছ, যা ভিটামিন
ডি এর উল্লেখযোগ্য উৎস), ডিমের কুসুম (একটি ডিমে প্রায় ১.৭ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন
ডি থাকে), মাশরুম (যেসব মাশরুম সরাসরি সূর্যের আলোতে বা UV রশ্মিতে বড় হয়,
সেগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়)।
এছাড়াও ভিটামিন ডি ফর্টিফাইড খাবার যেমনঃ দুধ, দই ও কমলার রস। গর্ভাবস্থা যেহেতু
একটি নারীর জীবনের স্পর্শকাতর সময় তাই প্রতিদিন ১৫-২০ মিনিট সরাসরি সূর্যের আলো
থেকে ভিটামিন ডি গ্রহণ করা সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকরী উপায়। শরীরের জন্য
প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি এর ৯০-৯৫% আসে সূর্যালোক থেকে তাই সুষম ও পুষ্টিকর
খাবারের পাশাপাশি প্রতিদিন কিছুক্ষণ রোদে থাকা জরুরি।
নোটঃ দোকান থেকে কেনা বাটন, অয়েস্টার বা শিতাকে মাশরুম নিরাপদ। বুনো বা জঙ্গলের
মাশরুমে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে তাই এটি এড়িয়ে চলুন। আপনার যদি মাশরুমে আগে
থেকে অ্যালার্জি থাকে তবে খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো।
এছাড়াও সামুদ্রিক মাছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি থাকলেও এতে পারদ জাতীয় পদার্থ
থাকে যা গর্ভবতী মায়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যেকোনো খাবার অতিরিক্ত খাওয়া ভালো
নয়, তাই মাশরুম বা চর্বিযুক্ত সামুদ্রিক মাছ পরিমিত পরিমাণে খান।
শরীরের ডিএনএ সংশ্লেষণ ও মেরামতে ভিটামিন বি-৯ এর কাজ ।
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ভিটামিন বি-৯ অতিব প্রয়োজনীয় একটি
ভিটামিন। এটি ফলিক এসিড বা ফোলেট নামে পরিচিত। ভিটামিন বি-৯ শরীরের ডিএনএ
সংশ্লেষণ ও মেরামত এর মত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। এটি লোহিত রক্তকণিকা
উৎপাদন করে যা রক্তাল্পতা দুরকরণে প্রতিরোধক। এছাড়াও কোষ বিভাজন ও শরীরের
প্রতিটি কোষে নতুন ডিএনএ তৈরিতে এটি অপরিহার্য ভূমিকা রাখে এবং শরীরের সামগ্রিক
বিপাকক্রিয়া সচল রাখতে এটি সাহায্য করে।
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ভিটামিন বি-৯ সমৃদ্ধ খাবার রাখলে
গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের মস্তিষ্কের নিউরাল টিউব ত্রুটি প্রতিরোধে প্রধান ভূমিকা
পালন করে। একজন মায়ের গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে মানসিক অবস্থা বা
মেজাজ বেশিরভাগ সময় খিটখিটে হয়ে থাকে এক্ষেত্রে ভিটামিন বি-৯, ভিটামিন B6
ও B12 এর সাথে মিলে রক্তে হোমোসিস্টাইনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, যা হৃদরোগের
ঝুঁকি কমায় এবং মেজাজ বা মানসিক অবস্থা ভালো রাখে।
এ সকল বিশেষ শারীরিক প্রক্রিয়ার জন্য একজন ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার
তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন বি-৯ সমৃদ্ধ খাবার রাখা অত্যন্ত জরুরি। পালং
শাক, ব্রকলি, বিট, মটরশুঁটি, কমলা, লিভার এবং শাকসবজিতে এটি প্রচুর পরিমাণে
ভিটামিন বি-৯ পাওয়া যায়।
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় মিনারেলস জাতীয় খাবারের ভূমিকা !
গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস যেহেতু একজন মা এবং নবগঠিত ভ্রূণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
পিরিয়ড। এই সময়টাতে গর্ভধারিণী মায়ের শারীরিক সুস্থতা এবং গর্ভের সন্তানের
সঠিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য যে পুষ্টি বা শক্তির প্রয়োজন তা গর্ভধারিনী
মায়ের খাদ্য অভ্যাসের উপর নির্ভর করে থাকে। এ কারণে ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবারের
পাশাপাশি মিনারেল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে মিনারেল সমৃদ্ধ
প্রাকৃতিক খাবার ছাড়াও অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের মিনারেল
সমৃদ্ধ সাপ্লিমেন্ট ট্যাবলেট সেবন করা উত্তম। এতে করে গর্ভধারিণী মা এবং সন্তানের
সুস্থতা ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় থাকে।
গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় আয়রণ এর ভূমিকা ।
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় আয়রন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ
এ সময় গর্ভবতী মায়ের শরীরে রক্তের পরিমাণ ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। একই
সাথে গর্ভের বাচ্চার জন্য হিমোগ্লোবিন তৈরিতে আয়রন অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। তাই
গর্ভবতী মায়ের শরীরে যদি আয়রনের অভাব হয় তবে রক্তস্বল্পতা হতে পারে, যা
মা ও শিশু উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই গর্ভধারণের শুরু থেকে একজন
মাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ আয়রন সমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে যাতে শিশুর
মস্তিষ্কের গঠন ও শারীরিক ওজন বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি না হয়।
এছাড়াও আয়রন গর্ভধারণের শুরু থেকে সন্তান জন্মানোর আগ পর্যন্ত মা এবং শিশুর
অক্সিজেন সরবরাহ কে স্বাভাবিক রাখে। একই সাথে গর্ভবতী মায়ের শরীরে মাংস পেশিতে
মাইগ্লোবিন তৈরির মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করার কারণে গর্ভাবস্থায় মায়ের মাথা
ঘোরা এবং শরীরের ক্লান্তি অনেকাংশে কমে যায়। তিন মাসের গর্ভবতী মায়ের
খাবার তালিকায় সঠিক মাত্রায় আয়রনের উপস্থিতি গর্ভের সন্তানের সঠিক ওজন
বৃদ্ধি এবং যথাসময়ে সন্তান জন্মানোর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে কচু শাক, পালং শাক, কলার মোচা, বিভিন্ন ধরনের ডাল,
ছোলা, বাদাম, খেজুর, কলা, সবুজ শাকসবজি, ডিম, মুরগির মাংস, গরু বা খাসির
কলিজা, লাল মাংস অন্যতম উৎস। এ সকল উৎস থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার গ্রহণ করলে
একজন গর্ভবতী মায়ের শরীরে আয়রনের ঘাটতি রোধ হয়। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে অনেক
সময় সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে অনীহা আসার কারণে আয়রন ঘাটতি যেন না আসে, সেই
লক্ষ্যে ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় প্রাকৃতিক খাবারের পাশাপাশি একজন
অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা প্রয়োজন।
নোটঃ তিন মাসের গর্ভবতী একজন মায়ের জন্য আয়রনের প্রাণিজ উৎসের তুলনায় উদ্ভিজ
উৎস থেকে প্রাপ্ত আয়রন গ্রহণ করা বেশি ভালো। একই সাথে গর্ভাবস্থায় আয়রন
ট্যাবলেট বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের সময় চা বা কফি জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত নয়
কারণ এ ধরনের খাবার আয়রন শোষণে বাধা দেয়।
শিশুর হাড়, দাঁত, হৃদপিণ্ড ও মাংস পেশী গঠনে ক্যালসিয়াম এর ভূমিকা ।
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ক্যালসিয়াম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে থাকে। কারণ গর্ভবতী মা সঠিক মাত্রায় ক্যালসিয়াম গ্রহণের মাধ্যমে
গর্ভের শিশুর হাড়, দাঁত, হৃদপিণ্ড ও মাংস পেশী গঠিত হয়। তাই তিন মাসের গর্ভবতী
মায়ের খাওয়ার তালিকায় প্রতিদিন ন্যূনতম ১০০০ থেকে ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম
সমৃদ্ধ খাবার রাখা প্রয়োজন। যা শিশুর শারীরিক গঠন তৈরির পাশাপাশি মায়ের হাড়ের
স্বাস্থ্য উন্নত করে।
ক্যালসিয়াম গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ও অকাল প্রসবের ঝুঁকি কমায়। ৩ মাসের
গর্ভবতী মায়ের ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার তালিকার মধ্যে সবুজ শাকসবজি যেমনঃ লাল
শাক, কচু শাক, পালং শাক, ব্রকলি, ঢেঁড়স, বাঁধাকপি অন্যতম। দুগ্ধজাত খাবারের
মধ্যে দুধ, দই, পনির বিশেষ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও কাঁটাযুক্ত মাছ, ডিম, চিয়া সিড,
তিল, তিশি, ডুমুর থেকে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
মূলত গর্ভাবস্থায় শিশুর হাড়, দাঁত, হৃদপিণ্ড ও পেশী গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম
সমৃদ্ধ খাবার অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই একজন গর্ভবতী মায়ের উচিত
পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। যাতে করে তা মায়ের শরীর থেকে
গর্ভের শিশুর শরীরে সরবরাহ হয়। মনে রাখতে হবে মায়ের শরীরে ক্যালসিয়ামের
অভাব হলে মা ও শিশু উভয়ের হাড় দুর্বল হয়ে যাবে। তাই গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের
পরামর্শ অনুযায়ী ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ
খাবারের পাশাপাশি ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে বাড়তি উপকার পাওয়া যায়।
ক্যালসিয়ামের শোষণের জন্য প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট সকালের রোদে থাকা বা ভিটামিন ডি
যুক্ত খাবার খাওয়া খুবিই ভাল।
গর্ভবতী মায়ের জন্য কতটুকু জিংক এর প্রয়োজন এবং এর উৎস।
জিংক ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাদ্য তালিকায় অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ একটি
উপাদান। কারণ গর্ভবতী মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ জিংকের উপস্থিতিতে শরীরের
কোষ বিভাজন, গর্ভের শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠন ও ডিএনএ (DNA) তৈরিতে সহায়তা করে
এবং মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। একজন গর্ভবতী মাকে প্রতিদিন ১১-১২
মিলিগ্রাম জিংক জাতীয় খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন।
যাতে করে গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি অর্থাৎ গর্ভস্থ
শিশুর টিস্যু তৈরি এবং মেরামত করতে সহায়তা করে। এছাড়াও গর্ভে শিশুর
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের জন্য যে পরিমাণ জিংকের প্রয়োজন হয় তা
গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকেই সরবরাহ করা হয়ে থাকে। সঠিক মাত্রায় জিংক গ্রহণ
গর্ভবতী মায়ের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী রাখে যা মা এবং শিশুকে বিভিন্ন ধরনের
সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে থাকে।
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় জিংক সমৃদ্ধ খাবার যেমনঃ মাছ, মুরগির
মাংস, গরুর মাংস, (কলিজা), ডাল, ছোলা, ডিম, কাজু বাদাম, চিনা বাদাম, শিমের
বিচি,কুমড়ার বীজ, শস্য জাতীয় খাবার ইত্যাদি রাখতে হবে। একজন গর্ভবতী মায়ের
শরীরে জিংকের অভাবে বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি বা বাচ্চা কম ওজনের হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় যেহেতু একজন মায়ের প্রতিদিন প্রায় ১১-১২ মিলিগ্রাম জিংকের
প্রয়োজন হয়। তাই এই সময়টাতে জিংক সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদান গ্রহণের
সাথে সাথে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শক্রমে সাপ্লিমেন্ট হিসেবে জিং ট্যাবলেট
গ্রহণ করা উচিত।
গর্ভস্থ শিশুকে ঘিরে থাকা পানির ভারসাম্য বজায়ে ফ্লুইড এর ভূমিকা ।
একজন মায়ের গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে বমি বমি ভাব বা অনেক সময় কিছু খেলে বমি
হওয়ার ভয়ে খাবার গ্রহণের ব্যাপারে অনীহা বা অরুচি প্রকাশ করে। এর ফলে
গর্ভবতী মা বিভিন্ন ধরনের সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খেতে ব্যর্থ হয়। যা তার শরীরের
জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়। তাই ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রতিদিন গড়ে ২.৫-৩
লিটার পানি বা পানি জাতীয় খাবার যেমনঃ ডাবের পানি, তাজা ফলের রস বা স্যুপ খাওয়া
খুবই জরুরি একটি বিষয়। কারণ এতে করে মায়ের শরীরে অ্যামনিওটিক ফ্লুইড
অর্থাৎ গর্ভস্থ শিশুকে ঘিরে থাকা পানির ভারসাম্য বজায় থাকে।
এছাড়াও গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন সময়ে কোষ্ঠকাঠিন্য একটি সাধারণ সমস্যা তাই তরল
জাতীয় খাবার আঁশযুক্ত খাবারের সাথে মিশে হজম প্রক্রিয়া সহজ করে অর্থাৎ
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, বমি বমি ভাব কমায় এবং মূত্রনালীর বিভিন্ন সংক্রমণ
রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাধারণত গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে বমিভাব বা 'মর্নিং সিকনেস' খুব বেশি হয়। এ
সময়ে পর্যাপ্ত তরল বা রসালো জাতীয় খাবার খেলে শরীর পানিশূন্যতা (Dehydration)
থেকে রক্ষা পায়। গর্ভাবস্থার মত এমন নাজুক সময়ে একজন মায়ের শরীর হাইড্রেটেড
থাকলে অনেকাংশে ক্লান্তিবোধ কম হয় এবং মায়ের শরীরে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক
থাকে সেই সাথে ভ্রূণে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ ঠিক থাকে।
গর্ভের সন্তানের জন্য ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড কেন গুরুত্বপূর্ণ ।
তিন মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড বিশেষ ভূমিকা পালন
করে। গর্ভের শিশুর মস্তিষ্কের গঠন, দৃষ্টিশক্তি এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের জন্য
ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড অত্যাবশ্যক। এটি অকাল জন্ম ঝুঁকি কমায় এবং গর্ভাবস্থায়
মায়ের উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করে এবং প্রসবোত্তর বিষণ্নতা দূর করতে সাহায্য করে।
তাই তিন মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবারের
পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা ভালো।
বিষয় এর শেষ কথাঃ
৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে আমরা ইতিমধ্যে বুঝতে
পারলাম একজন দায়িত্বশীল ও সচেতন মা’ ই পারে একটি সুস্থ, সবল, মেধাবী সন্তান জন্ম
দিতে। কারণ একটি নবাগত সন্তান কেমন হবে তা নির্ভর করে মাতৃত্বকালীন সময়ে
একজন মা কি ধরনের পুষ্টিকর বা সুষম খাদ্য গ্রহণ করেছে তার উপর। মূলত যে মা
পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে সচেতন, সেই মা’ ই নিজের শরীরের
সুস্থতা এবং গর্ভের সন্তানের শারীরিক ও মানসিক গঠনে ততটা ভূমিকা পালন করে থাকে।
গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে যেহেতু বিভিন্ন বিষয়ে অসতর্কতা বা সচেতন না থাকার
কারণে অনেক মায়ের গর্ভপাত ও গর্ভকালীন অন্যান্য জটিলতা বেশি হয়ে থাকে। তাই
গর্ভধারণের এই সময়টাতে একজন মাকে তার খাদ্যা অভ্যাস এবং বিশ্রামের প্রতি
অনেক বেশি সচেতন ও যত্নবান হতে হবে। মূলত গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসেই একজন মা
নিজেকে তৈরি করবে একটি সুস্থ সবল ও মেধাবী শিশুর জন্ম দেওয়ার জন্য।
সন্তান জন্ম নেওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের সুস্থতা এবং গর্ভের সন্তানের শারীরিক ও
মানসিক গঠনে একজন সচেতন মা দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়। কারণ একজন সচেতন মা’ ই
জানে গর্ভের সন্তান সঠিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য যে পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন তা
গর্ভাবস্থায় মায়ের সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল।
এ কারণে ৩ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা জানা প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের মৌলিক
দায়িত্ব।
তবে প্রতিটি মানুষের শরীর আলাদা ধরনের। তাই গর্ভধারণের পর খাদ্যাভ্যাসের বিষয়ে
একবার আপনার নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নেবেন।



“সফল প্লাস” এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url